প্রচ্ছদ

প্রতিটি শব্দে যুক্ত করতে চেয়েছি আমার বোধ-বিন্যাস ও পাঠক্রিয়া

Eurobanglanews24.com

হাবীবুল্লাহ সিরাজীর প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯৭৫ সালে; ‘দাও বৃক্ষ দাও দিন’। দু’বছর পর প্রকাশিত হয় ‘মোমশিল্পের ক্ষয়ক্ষতি’। বইটি তাঁকে পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে আসে, তিনি প্রশংসিত হন। নানা বিষয়ে তাঁর গ্রন্থসংখ্যা প্রায় সত্তরটি। এর মধ্যে কাব্যগ্রন্থ ত্রিশের অধিক। অনুবাদ করেছেন রুমি ও রসুল হামজাতভের কবিতা।  পাশাপাশি উপন্যাস, ছোটগল্প ও স্মৃতিকথা লিখেছেন। তাঁর কবিতা ইংরেজি, ফরাসি, সুইডিশ ভাষাসহ ভারতীয় বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। লেখালেখির স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ অন্যান্য পুরস্কার ও সম্মাননা। বুয়েট থেকে শিক্ষাজীবন শেষ করে দেশে ও বিদেশে নানান প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত থেকে বর্তমানে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন। বাংলা কবিতার ঐতিহ্য ও আধুনিকতা প্রসঙ্গে কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কথাসাহিত্যিক মোজাফ্‌ফর হোসেন। শ্রুতিলিপি করেছেন স্বরলিপি।

 

মোজাফ্‌ফর হোসেন: আপনি ষাটের দশকের কোন সময় লিখতে শুরু করলেন?

 

হাবীবুল্লাহ সিরাজী: সেই অর্থে লেখালেখি শুরু করি ১৯৬৬ সালে। তার আগে সামান্য প্রস্তুতিপর্ব ছিল।

 

মোজাফ্‌ফর হোসেন: অর্থাৎ তখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রস্তুতি চলছে। আমাদের লেখক-কবিরা তখন শুধু শিল্পের দায়িত্ব না, জাতীয় দায়িত্ব পালন করছেন— রাষ্ট্রগঠনে কাজ করছেন। একইসঙ্গে স্বাধীন রাষ্ট্রের ভাষা কেমন হবে—শিল্পের ভাষা, সাহিত্যের ভাষা— সেটাও তৈরি করছেন। আপনি কি এ বিষয়ে তখন সচেতন ছিলেন?

 

হাবীবুল্লাহ সিরাজী: সেটা তৈরি হয়ে যাচ্ছে। তার কারণ এখানে দেশভাগের পর যাঁরা কবিতা লিখতে শুরু করলেন তাঁরা যেন কলকাতার হাওয়াকে ঢাকায় এনে দাঁড় করাতে চাইলেন। সেটা দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই পঞ্চাশে এসে একটা নতুন কবিতার আন্দোলন হয়ে গেল। এবং নতুন কবিতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের ভালো কবিদের—  মেজর কবিদের পেয়ে গেলাম। ষাটে এসে আমরা আমাদের এই অংশকে আন্তর্জাতিকতার সঙ্গে যুক্ত করতে চাইলাম।

 

মোজাফ্‌ফর হোসেন: আপনি নিজে তখন সময়ের ব্যাপারে কতটা সচেতন ছিলেন?

 

হাবীবুল্লাহ সিরাজী: সচেতন না হয়ে আমাদের কোনো উপায় ছিল না। ৬৬’র কথা আমি আগেই উল্লেখ করেছি। অস্তিত্বের লড়াইয়ের সাথে আমাদের সামনে একটি সুন্দর সমাজ গঠনের ডাক ছিল। আমাদের সামনে স্বপ্ন ছিল, একটি সুন্দর সমাজব্যবস্থা নির্মাণের ডাক ছিল। এই স্বপ্নগুলো ১৯৬৬ সনে রাজনৈতিকভাবে প্রোথিত হয়ে গেছে। যার ফলে, যারা সচেতনভাবে লেখালেখি শুরু করলেন তাঁরা প্রত্যেকেই নিজস্ব ভাষা নির্মাণ এবং নিজস্ব পথনির্মাণের দিকে এগোলেন। ১৯৬৬ থেকে শুরু করে ১৯৬৮ পর্যন্ত উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিদেশি কবিতা অনুবাদ করেছি। তার ভেতরে রুশ কবিতা, চৈনিক কবিতা এবং পশ্চিমের আরো অনেক দেশের কবিতা। এটি ছিল আমার নিজস্ব ভাষা তৈরির পাশাপাশি দেশ থেকে যে রাজনীতি উঠে আসছে তার সঙ্গে যুক্ত হওয়া। ব্যক্তিগতভাবে আমি প্রকৌশলের ছাত্র, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেছি ১৯৬৬ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত। আমি সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। এবং আমি নির্বাচিত প্রতিনিধিও ছিলাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে। অতএব কখনো রাজনীতি আমার পিছু ছাড়েনি। বাংলাদেশের রাজনীতি ধরার জন্য, বাঙালির রাজনীতি ধরার জন্য, বাংলা ভাষার রাজনীতি ধরার জন্য তার পিছে-পিছে ছুটেছি।

 

মোজাফ্‌ফর হোসেন: এখান থেকে একটা কথা আসে। কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীর রাজনৈতিকসত্তা এবং শিল্পীসত্তা এই দুটোর সমন্বয় কেমন হয়েছে কবিতার ক্ষেত্রে?

 

হাবীবুল্লাহ সিরাজী: এখানে আরো একটি ট্রাজেডি আছে। যারা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেন তাদের সময়ের মূল অংশটুকু খেয়ে ফেলে তাদের একাডেমিক পাঠ। তার ফাঁকে রাজনীতিতে আসা এবং কবি হয়ে ওঠার পরিভ্রমণে যুক্ত হওয়া সহজ নয়। আমি এখন এটুকু বলতে পারি, ৭০ বছর বয়স পার করে মনে হয় কবিতাই আমার কাছে প্রথম ছিল। দ্বিতীয় রাজনীতি এবং তৃতীয়ত একাডেমিক পাঠ। ফলে মোটামুটিভাবে লেখাপড়াটা চলে যাক—  পরে কি হবে না হবে দেখা যাবে, প্রাণের চর্চাটা প্রধান হয়ে থাকুক এটাই আমার ইচ্ছা ছিল। আজ অব্দি সেই ইচ্ছা থেকে আমি কখনো চ্যুত হইনি। কেননা, আমার বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আমি দেশ পেয়েছি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে। রাজনীতি বলতে আমি মানুষের রাজনীতি করি, মাটির রাজনীতি করি।

 

মোজাফ্‌ফর হোসেন: যদি আবার কবিতার প্রসঙ্গে যাই, একবার অক্তাবিও পাস রবার্ট ফ্রস্টের সঙ্গে দেখা করেছেন। পাস তখন তরুণ। ফ্রস্ট তাঁকে বলেছিলেন, প্রত্যেক তরুণ কবির কাজ হচ্ছে নতুন কিছু নিয়ে আসা। এবং তার প্রথম কাজ হচ্ছে তার ঐতিহ্য অস্বীকার করে নতুন একটা জায়গায় পা ফেলা। আপনি যখন কবিতা লিখতে এসেছেন নতুন বাংলাদেশের কবিতার ঐতিহ্য কি হবে এটা নিয়ে অনেকেই দ্বিধান্বিত থেকেছেন— ধর্মীয় ঐতিহ্য নাকি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, এসব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই ঐতিহ্যের সঙ্গে থাকা আবার না থাকা নিয়ে কী বলবেন?