প্রচ্ছদ

‘আমার সবচেয়ে বেশি প্রিয় আলস্য, নারীর চেয়েও প্রিয়’

Eurobanglanews24.com

এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’—এই অমর পঙ্ক্তিই বিখ্যাত করেছে কবি হেলাল হাফিজকে, পাল্টে দিয়েছে তাঁর জীবনধারাও। ৭ অক্টোবর বাংলাদেশের জনপ্রিয় এই কবির ৭২তম জন্মদিন। জন্মদিনের ক্ষণে প্রথম আলোর মুখোমুখি হয়ে প্রথমবারের মতো তিনি উন্মোচন করলেন তাঁর লেখালেখি, প্রেম, বিরহসহ জীবনের নানা অজানা অধ্যায়।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হাসান হাফিজ।

হাসান হাফিজ: ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ নামে একটি কবিতা লিখে যৌবনেই বিখ্যাত হয়ে যান আপনি, সেই কবিতায় তখন লিখেছিলেন ‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়/ এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।’ বর্তমানে জীবনসায়াহ্নে এসে বার্ধক্যে উপনীত হয়ে ওই ধরনের পঙ্ক্তি কি আর লিখতে ইচ্ছা করে? কী মনে হয় এখন এই কবিতার দিকে তাকিয়ে?

হেলাল হাফিজ: ‘এখন যৌবন যার…’, এই দ্যুতিময় পঙ্ক্তির যিনি স্রষ্টা, তিনি তো চিরনবীন। বাস্তবে তার বয়স যতই হোক না কেন। এটা ঠিক, শরীর একটা বড় ফ্যাক্টর। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সমাজে যত দিন অন্যায় উৎপীড়ন অনিয়ম অনাচার থাকবে, এই পঙ্ক্তিমালাকে আশ্রয় করে প্রতিবাদী কিছু মানুষ ঘুরে দাঁড়াতে চাইবে। রুখে দাঁড়াবে অন্যায় ও বৈষম্য। এই কবিতাপঙ্ক্তি তাদের প্রাণিত করবে। এমনটা হতেই পারে যে বেশির ভাগ মানুষ ক্ষমতার বলয়ের মধ্যে থাকতে চাইবে। কলাটা-মুলোটার জন্য। কিন্তু কিছু মানুষ তো ব্যতিক্রমী থাকবেই। তারা রুখে দাঁড়াবে। অন্যায়-অবিচারের অবসান চাইবে।

 

হাসান: এই কবিতা লেখার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জানতে চাই।

হেলাল: কবিতাটা লেখা হয়েছিল ১৯৬৯ সালের গণ-আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে। তখন জাতি ছিল স্বাধীনতা-উন্মুখ, দেশ ছিল টালমাটাল। ওই সময়ে দেশ যে কেমন অগ্নিগর্ভ ছিল, এখনকার ছেলেমেয়েরা তা চিন্তাও করতে পারবে না। আজকাল মিছিল-মিটিং হয় টাকার বিনিময়ে। সে সময়ে এ রকমটা হতো না। সবই হতো স্বতঃস্ফূর্তভাবে। আদর্শের একটা ব্যাপার ছিল। আমি কোনো রাজনৈতিক বা ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না; না ছাত্রজীবনে, না কর্মজীবনে। কোনো মিছিলে আমি কখনো যাইনি। তবে ভেতরে-ভেতরে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের স্বপ্ন-প্রত্যাশা, আশা-আকাঙ্ক্ষার ব্যাপারটি বুকে ধারণ করতাম ঠিকই। ‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’—ওই কবিতাটা সময়ই আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছে।

 

হাসান: সময় তো আপনাকে দিয়ে ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ লিখিয়ে নিল, কিন্তু এ কবিতার কথা মানুষ জানল কীভাবে?

হেলাল: ছফা ভাই (আহমদ ছফা) ও কবি হুমায়ুন কবির সদ্য লেখা সেই কবিতাসহ আমাকে নিয়ে গেলেন দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকা অফিসে, স্বনামধন্য কবি আহসান হাবীবের কাছে। হাবীব ভাই তখন দৈনিক পাকিস্তান-এর সাহিত্য পাতা সম্পাদনা করেন। তিনি কবিতাটি পড়লেন। তারপর মিষ্টি করে একটু হাসলেন। পড়া শেষে বললেন, শোনো তোমরা, এই কবিতা ছাপা যাবে না। ছাপলে আমার চাকরিটা চলে যাবে। পত্রিকা বন্ধও হয়ে যেতে পারে। তবে একটা কথা বলি, হেলালের আর কোনো কবিতা না লিখলেও চলবে। অমরত্ব ওর করায়ত্ত হয়ে গেছে।

ওই একটা কবিতা আমার জীবনকে পাল্টে দিয়েছে। কর্মজীবনের যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা, মানুষজনের আদর-আপ্যায়ন যা পেয়েছি জীবনে, তার পেছনে এই কবিতার বড় অবদান রয়েছে। আমি যখন ছাত্র, তখনই আমার চাকরি হয়ে যায় দৈনিক পূর্বদেশ-এ। সেটা সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে। সম্পাদক এহতেশাম হায়দার চৌধুরী দ্বিধান্বিত ছিলেন, ছাত্রকে কেমন করে চাকরি দেবেন। তখন অবজারভার হাউসের বড় কর্তা কবি আবদুল গনি হাজারী হায়দার ভাইকে বলেন, যে ছেলে এমন কবিতা লিখতে পারে, তার ব্যাপারে অন্য কোনো কিছু বিবেচনার দরকার নেই। তুমি বাপু, এখনি নিয়োগপত্র দিয়ে দাও ওকে। ব্যস, চাকরি হয়ে গেল আমার।

 

হাসান: আপনার জীবন নিয়েও রয়েছে নানা কিংবদন্তি। আজীবন হোটেলে হোটেলে কাটালেন। প্রেসক্লাবে আড্ডা দিয়ে জীবন পার করলেন। জীবনটাকে এমনভাবে বইতে দিলেন কেন?

হেলাল: ওই যে বললাম, ওই একটি কবিতা আমার জীবনধারা পাল্টে দিয়েছিল, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এসে ওই কবিতা আমাকে রীতিমতো স্টার বানিয়ে দেয়। এখন কী মনে হয় জানো, তা-ই বোধ হয় কাল হয়েছে। উত্তাল উনসত্তরের অগ্নিঝরা সময়ে ওই কবিতা লেখার পর অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটতে থাকল আমার জীবনে। মাত্র দুই রাতে গোটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের দেয়ালে দেয়ালে স্লোগান হিসেবে এই পঙ্ক্তি লেখা হলো। চিকা মারা যাকে বলে। এখনকার প্রজন্ম অবশ্য চিকা মারা কী, সেটার মর্ম বুঝতে পারবে না। গভীর রাতে, ভীতিকর পরিবেশে দেয়াললিখনরত তরুণদের জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কী করছ? উত্তরে ওরা বলেছিল, চিকা (ছুঁচো) মারছি। সেই থেকে দেয়াললিখনের কাজকে বলা হতো চিকা মারা।

সেই সময় এমন হতো, হল থেকে ক্লাসে যাচ্ছি, টিএসসিতে যাচ্ছি, মেয়েরা বলাবলি করত, ওই যে কবি যায়। আমার নাম বলত না, ওই কবিতার কথা বলত। স্বাধীনতার পরও চার-পাঁচ বছর আমি সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে (সাবেক ইকবাল হল) ছিলাম। তখন নিয়ম ছিল, পরীক্ষা হয়ে গেলে হলের সিট ছেড়ে দিতে হতো। প্রভোস্টকে বলায় তিনি বললেন, ‘আচ্ছা, তুমি থাকতে পারবে।

বিনোদন

আর্কাইভ

May 2020
M T W T F S S
« Apr    
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031