প্রচ্ছদ

পূজার গল্প || সিঁদুর খেলা

Eurobanglanews24.com

একটা খাপে দুটো তলোয়ার রাখা যায়?

 

যায় হয়ত, কিন্তু খাপের হাল যে তাতে খুব সুবিধের হয় এমন বলা যাবে না। ঠিক তেমনি এক পাড়ায় যদি চার-চারটে খাণ্ডার গিন্নী থাকে তবে সে পাড়ায় বারোয়ারি পুজোর যে বারোটা বেজে যাবে তাতে সন্দেহ থাকা উচিত নয়।

 

আচ্ছা বলুন দেখি, বারোয়ারি পুজোর সবচেয়ে শক্ত কাজটা কী?

 

চাঁদা তোলা?

 

না। যদি পাড়া ফিলিংসটা থাকে আর বাসিন্দারা সচ্ছল হয় তবে সেটা খুব একটা প্রবলেম নয়, কয়েকটা ছ্যাঁচড়া কিপ্‌টে সব পাড়ায় থাকে, তাদের সামলানো খুব বড় একটা অসুবিধাও নয়।

 

তাহলে খাটা খাটনি?

 

না, সব পাড়ায় কিছু কমবয়েসি ছেলে থাকে, যারা মনে করে হুমদোর মত চেহারা নিয়ে পুজোর সময় টাইট গেঞ্জি আর গলি দেখান জিন্স পড়ে ঠাকুর তোলাই পাড়াই এসব মজদুরি কাজ আসান করলেই ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় ঝুমকি পটে যাবে এবারের পুজোর জন্য।

 

তবে কি বিসর্জন?

 

না, আপনাদের দিয়ে হবে না। সবচেয়ে শক্ত কাজ হলো- পাড়ার বারোয়ারি পুজোর ভোগ ইত্যাদি কোথায় হবে, আর কে তাতে কতটা মোড়লি করতে পারবে তার দখলদারি। কারণ কন্ট্রোল করতে গেলে হেঁসেল হলো সেরা জায়গা।

 

এ পাড়ায় চার-চারটে খাণ্ডার গিন্নী আছে- ব্যানার্জী, রায়, দত্ত আর পাল। ব্যাকগ্রাউন্ড জেনে রাখা ভালো। ব্যানার্জী হলো চাটার্ড, রায় জজ, দত্ত বুলিয়েন মার্চেন্ট (স্যাকরা বললে মানহানি), পাল লোকাল কাউন্সিলার। ভাবছেন বাব্বা! এতো তালেবর ব্যাপার! না, তালেবর হলো তাদের বউ! বরেরা ছোট বেলার বন্ধু। এখন বউয়ের ভয়ে মাল খেতে লুকিয়ে দীঘা, মন্দারমণি পালায়। বাড়িতে বলে- মিটিং।

 

এপাড়ায় যখন দুর্গাপুজো শুরু হয় তখন এই বউগুলো এত খাণ্ডার হয়ে ওঠেনি। সব ক’টার শাশুড়ি বেঁচেবত্তে ছিল আর নিজেদের ছেলেপুলেগুলোও সব পড়াশোনা করত। তাই বারোয়ারি ছিল বারোয়ারির মত। জোগাড় জাগাড়ে পাড়ার অন্য বাড়ি থেকেও যেমন বৌয়েরা আসত, এই চার বাড়ি থেকেও বউমারা যেত শাশুড়িদের সাথে। আর ক্লাব ঘরেই ভোগ ইত্যাদি হতো। সবাই বাড়ি থেকে কৌটো নিয়ে গিয়ে ভোগ এনে নিজেদের বাড়িতেই খেত। ২০০০ সালের পর থেকেই তালগোলটা পাকালো। এদের শাশুড়িরা চারজনেই কয়েক মাসের আড়াআড়ি স্বর্গবাসী হলেন। বরেরা সব হাসব্যান্ড হয়ে গেল। আর তাঁদের টাকাকড়ি প্রভাব প্রতিপত্তি সবই ধাঁ ধাঁ করে বেড়ে গেল। চারটে পরিবারের চারটে ছেলেমেয়ে লেখাপড়া শেষ করে রোজগেরে হলো। ফলত এই চারজন নিজেদের অজান্তেই একটা পাওয়ার প্লেতে জড়িয়ে গেল। ছিলেন ডেপুটি গিন্নী, হলেন ফুল ফ্লেজেড গিন্নী। আর জনসমক্ষে মিসেস অমুক, মিসেস তোমুক। আর বর রোজগেরে স্বাভাবিক, কিন্তু আইবুড়ো মোটা রোজগেরে ছেলে! সে হলো গে উরিঃ ব্বাবা!

 

২০০৩ সালে ক্লাবঘরের টিনের চাল বদলে ঢালাই ছাদ হবে বলে ঠিক হলো। সেই মত কাজও শুরু হলো। কিন্তু পুজোর আগে তা শেষ হলো না। কোথায় হবে পুজোর ভোগ রান্না আর অন্য সব জোগাড়? রায় গিন্নী বামুনের তাসটা খেললেন, আর মায়ের পুজোর সব ব্যাপার নিজের বাড়িতে টেনে নিলেন। পুজোর কাজেকর্মে সবই ঠিকঠাক ছিল কিন্তু নিজের বাপের বাড়ি তস্য আত্মীয় সবাইকে মাঠে নামিয়ে এমন শোরগোল ফেলে দিলেন যে আর কহতব্য নয়! পাড়ার অন্য বউঝিয়েরা গ্যালারিতে। এদিকে পাকালো অন্য জায়গাতে, রায় সাহেবের বড় শালার মেয়েকে দেখে, সৌগত দত্তের পালে প্রেমের হাওয়া লাগল- একটুসখানি! ও সব পুজোতেই একটু-আধটু হয়; মা জলে পড়ে, সাথে প্রেমও। কিন্তু এই দুই মিয়া বিবি পুজো পার করেও দেখা সাক্ষাত চালাতে লাগল। জাতধম্মের ক্যাচাল না পাড়লে সৌগত আর মিলির বিয়েটা খুব একটা খারাপ হওয়ার নয়। কিন্তু একে জজসাহেব, তায় জাতে বামুন, তার শালার মেয়ে বলে কথা। সে কি না… তা আমাদের রায় গিন্নী রেগেমেগে সৌগতের মাকে ডেকে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে দিলে সাত কথা শুনিয়ে।

 

পরের বছর শোধ তুললেন দত্ত গিন্নী। পুজোর মিটিঙে কে কত টাকা দেবে এই সব যখন চলছে সৌমেন দত্ত ঘামতে ঘামতে বললেন, তিনি দিবেন ৫১ হাজার ১ টাকা। তখনো থিমে থমথমে পুজো আমাদের এখানে সেভাবে চালু হয়নি। ৫১ শুনে তো পাড়ার ছেলেদের জীভে জল চোখে R.C.। কিন্তু টোপের পিছনে ছিল বঁড়শি। পুজোর বাকী সব কাজকর্ম হবে ব্যানার্জী গিন্নীদের বাড়ি। ক্লাব কিন্তু ততদিনে পাকা ছাদের হয়ে গেছে। কিন্তু ক্লাবের বাকীরা ভাবল- এই সব সাত্বিক ব্যাপার বামুন বাড়িতেই হওয়া উচিত। ক্লাবঘর ফর তামসিক ক্লাব এক্টিভিটিজ। মানে একটু… ঐ আর কি, আপনাদের আর বেশী কি বলব!

 

তা সৌমেন দত্তকে তাঁর বাকী বন্ধুরা মিটিং করতে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, তুই মরতে ৫১ হাজার কবুল করতে গেলি কেন? ঘামছিলি তো বলতে গিয়ে।

 

সৌমেন দত্ত গ্লাসের মাল একঢোকে গলায় চালিয়ে হতাশ ভাবে বলল, কবুল করেছিলাম কি আর সাধে? বলে কি একটা শাড়ির দোকান না বুটিক কি একটা বানাবে, তার জন্যে সাড়ে তিন লাখ টাকা দিতে হবে। তাও আবার কোন মাসশাশুড়ির সাথে পার্টনারশিপ। আমি বাবা শ্বশুরবাড়ির সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্কের বিরোধী তাই গাঁইগুঁই করছিলাম। তখন বলে কি পাড়ায় মা দুর্গার পুজো ধুমধাম করে করবে? ছেলে অত ভালো একটা কাজ পেল তার জন্যে। তা মায়ের পুজো- কি আর বলি বল?