প্রচ্ছদ

শিলং-চেরাপুঞ্জির দিনপঞ্জি

Eurobanglanews24.com

মাওলাইনং গ্রামে দুপুরের দিকে কেউ কেউ দোকানের ঝাঁপি খুলেছেন। কেউ কেউ করছেন গৃহস্থালির কাজ। গাড়ি থেকে গ্রামটিতে নেমে কিছুটা সময় লাগল ধাতস্থ হতে। গুগল যে তাপমাত্রার কথা জানিয়েছিল, অনুভূতি তো তার চেয়েও তীব্র। তবে গুগলের একটা তথ্য সঠিকই মনে হলো, মাওলাইনং এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম! প্রতিটি বাড়ির সামনেই সরু রাস্তায় পর্যটকদের জন্য ইটের সিঁড়ি, আর সব জায়গাতেই রাখা আছে বেতের তৈরি ময়লা ফেলার ঝুড়ি। ইচ্ছা করলেও ঝুড়ির বাইরে ময়লা ফেলার উপায় নেই। এ গ্রামের প্রাকৃতিকভাবে গাছের শিকড়ে তৈরি লিভিং রুট ব্রিজের একদিকে সবুজ গাছের শিকড়ের সেতুর টান অন্যদিকে প্রবহমান ঝরনা। ঝরনার জল গড়ানোর শব্দে ফরাসি কোনো বেহালাবাদকের মাতাল সুরের আবেশ। একটানা বেজেই চলেছে। ভারতের শিলংয়ের গ্রামের ঝরনার এই আবেশ নিয়েই ফিরতি পথ ধরেছিলাম।

 

গত ১০ আগস্ট বৃষ্টি মাথায় নিয়ে সিলেটের দক্ষিণ সুরমা থেকে আমরা রওনা দিয়েছিলাম সকাল সাতটায়। এ ভ্রমণে আমরা মোট চারজন। গন্তব্য—তামাবিল-ডাউকি সীমান্ত পার হয়ে মেঘ-ঝরনার লীলাভূমি ভারতের শিলং-চেরাপুঞ্জি। যাত্রার পর প্রথম গন্তব্য মাওলিনং গ্রামে পৌঁছে যাই দুপুরের মধ্যে। গ্রামের সৌন্দর্য উপভোগ করে ক্লান্তির ঘোর কাটতে শুরু করে।

 

এবার গন্তব্য শিলং শহর। মধ্যাহ্নভোজের বিরতি। রেস্তোরাঁর অনেকটা জায়গাজুড়ে সবুজ ঘাস, ঘাসের গালিচার মধ্যেই গোলটেবিল আর চেয়ার। হঠাৎ করে স্কটল্যান্ড ভেবে বসলেও যেন ভুল হবে না। চারপাশে যত দূর চোখ যায় বিস্তৃত সবুজ দিগন্ত আর নীলচে পাহাড়ের মেলবন্ধন। কিশোরী মেয়ের মতো মেঘের চাঞ্চল্য তো আছেই। খাবার সে–ও ছিল অমৃত। এমন পরিবেশে গা এলিয়ে অপরাহ্ণে চা পান না করে উঠে যাওয়া বাঙালির আদুরে দুপুর-স্বভাবের বৈপরীত্য! আমরাও পারিনি। চা খেতে খেতেই সূর্যটা গিয়ে এলিয়ে পড়ল পশ্চিম আকাশে। সময়ের হিসাব তো আর মাথায় ছিল না। মুঠোফোন, ক্যামেরা যে যার মতো চারপাশের সৌন্দর্যকে ফ্রেমবন্দী করতে ব্যস্ত ছিলাম তো। যাই হোক, এবার নির্দেশনায় কোনো বিরতি ছিল না, যাত্রা সোজা হোটেল। ততক্ষণে সন্ধ্যার বাতি জ্বলতে শুরু করেছে। পাহাড়ের কোল ঘেঁষা ছোট ছোট বাড়িগুলো আবছা দেখতে পাচ্ছি। শহরের কাছাকাছি গিয়ে মনে হলো, প্রকৃতিকে খুব বেশি না ঘাঁটিয়েই তার আদুরেপনা ও বেখেয়ালেই অস্তিত্ব বজায় রেখেই সেজেছে শিলং শহর।নতুন জায়গায় এসে একেবারেই বিপদে না পড়লে চলে? আমাদের চালক নামিয়ে দিলেন গেস্টহাউসে। তবে, একটু সময় পরেই বুঝতে পারলাম, আমরা একই নামের অন্য একটি গেস্টহাউসে নেমে গিয়েছি বা চালক ভুল করে নামিয়ে দিয়েছেন। তবে গেস্টহাউসের মালিক নিজে থেকেই এগিয়ে এলেন। আমাদের বুকিং দেওয়া অ্যাপার্টমেন্ট হাউসের নম্বরে ফোন দিয়ে কথা বলিয়ে দিলেন। পরে কম সময়ে আমরা পৌঁছে গেলাম আমাদের নির্ধারিত ঠিকানায়। কিন্তু আবার মন খারাপের পালা। অনলাইনে ছবিতে যেমন দেখে বুকিং দিয়েছিলাম, আদতে তা নয়। তবে ক্লান্তিতে এত কিছু নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় নেই, যে যার মতো ঘুমিয়ে গেলাম। পরের দিন ভোরেই জায়গা পরিবর্তন করে অ্যামেনিটিতে উঠে গেলাম, অর্থাৎ গত রাতে ভুল করে যেখানে উঠেছিলাম।

 

নতুন শহরে নতুন সকাল। আজকের গন্তব্য চেরাপুঞ্জি, সেভেন সিস্টার্স ফল। সকালের নাশতায় আলু পরোটার সঙ্গে ডিম ভাজি আর চা খেতে খেতেই গাড়ি হাজির।

 

রাস্তার চারপাশের পাহাড়ঘেরা সবুজ আবহ আর নির্জনতা। আমরা পৌঁছে গেলাম মেঘালয়কন্যা চেরাপুঞ্জিতে। চেরাপুঞ্জিতে বেলা-অবেলায় মেঘের খ্যাতি রয়েছে বৃষ্টি ঝরানোর। তবে আমরা বৃষ্টির দেখা পেলাম না। রোদেলা স্নিগ্ধতায় সাতটি ঝরনার নৈসর্গিক গানের তালে তালে চঞ্চল হয়ে উঠল আমাদের মন। ঝরনাগুলোর নিচের অংশে প্রাকৃতিকভাবেই তৈরি হয়ে যাচ্ছে রংধনুর সাতটি রং। ঘোর লাগে এর অভাবনীয় সৌন্দর্যে।

 

দ্বিতীয় দিনের মতো যাত্রা শেষ। সন্ধ্যা নেমে আসার আগেই শহরে ফেরার পালা। শহরে নয়টা বাজলেই থেমে যায় সব কর্মব্যস্ততা। রাতে ফ্রেশ হয়ে আমরা গেস্টহাউসের ডাইনিং রুমে বসলাম। আলুর দম, ডালমাখানি, ডিমের ঝোল আর মুরগির মাংস, রাতের ওই খাবারের স্বাদ জিবে লেগে আছে এখন অবধি।

আর্কাইভ

সেপ্টেম্বর ২০১৯
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« আগষ্ট    
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০