প্রচ্ছদ

জান্নাত কষ্ট দিয়ে ঢাকা, অলসতা ঝেড়ে ফেলো মুমিন!

Eurobanglanews24.com

জান্নাত ও জাহান্নাম দুটি বিপরীত জায়গার নাম। জান্নাতে আছে অফুরন্ত নাজ-নেয়ামত। যেখানে যাওয়ার পর কারো কোনো দুঃখ থাকবে না। আর জাহান্নামে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। যেখানে গেলে কষ্টের শেষ থাকবে না।

জান্নাত ও জাহান্নামের বিশ্বাস ইসলামের মৌলিক আকীদার অন্তর্ভূক্ত। মানুষকে জাহান্নামে যেতে হলে কোনো কষ্ট-ক্লেষ সহ্য করতে হয় না, কিন্তু জান্নাতে যেতে হলে কঠোর নিয়ন্ত্রণ মেনে জীবন যাপন করতে হয়। মনের খায়েশাত ত্যাগ করে আল্লাহর বিধানের সামনে পূর্ণ আত্মসমর্পণ করতে হয়। এই হাকিকত নবীয়ে দুজাহান (সা.) বাস্তব উদাহরণ দিয়ে আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছেন।

 

তিনি (সা.) বলেন, ‘দুনিয়ার জীবনটা হচ্ছে মুমিনের জন্য কারাগার আর কাফেরের জন্য জান্নাত’। আমরা জানি, কারাগারে কোনো বন্দিই নিজের মতো খেতে পারে না, পরতে পারে না এবং চলতেও পারে না। খেতে হয় কারা কর্তৃপক্ষের দেয়া খাবার। পরতে হয় কয়েদিদের ড্রেস। আর সারা দিনে নির্দিষ্ট কিছু সময় কারা পুলিশের তত্তাবধানে বাইরে বের হওয়ার সুযোগ থাকে। জান্নাত ও জাহান্নামে যাওয়ার উদাহরণটা কেমন যেন মূর্খ ও শিক্ষিতের মতো। কাউকে মূর্খ হতে হলে কিছুই করতে হয় না। শুধু কষ্টের পড়া লেখা না করলেই চলে। কিন্তু শিক্ষিত হতে হলে বহু রজনীর ঘুম ও সময়ের আমোদ-ফূর্তি কোরবানি করতে হয়। কোরআন ও হাদিস থেকে এমন কিছু বাণী পেশ করা হচ্ছে, যেখানে এই বাস্তবতাটা তুলে ধরা হয়েছে।

দুনিয়াটাকে মোহনীয় করে তোলা হয়েছে: দুনিয়ার প্রতি মানুষের আসক্তি মন্দ কোনো বিষয় নয়। তবে মন্দ হচ্ছে দুনিয়ার মোহে পড়ে দ্বীনের ব্যাপারে গাফেল হয়ে যাওয়া। আল্লাহকে ভুলে মনের খায়েশ মেটাতে ব্যতি-ব্যস্ত হয়ে যাওয়া। আল কোরআনে বলা হয়েছে, ‘দুনিয়াটাকে মানুষের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে লোভনীয় বস্তু হিসেবে। তবে যারা মুমিন তারা ওগুলোর পিছনে না পড়ে আল্লাহর নিকট স্থায়ী নিয়ামতের আশায় আমলে রত থাকেন’। বলা হয়েছে, ‘মানুষের জন্য সুশোভিত করা হয়েছে আকর্ষণীয় বস্তু সমূহের প্রতি ভালোবাসা- যথা নারী, পুত্র, সোনা ও রূপার ভাণ্ডার, চিহ্নিত ঘোড়া, গবাদি পশু ও ফসল। (তবে মনে রেখো) এ সব পার্থিব জীবনের ভোগ্য সামগ্রী’। (সূরা আলে ইমরান-১৪)।

তারপর বলা হয়েছে ‘(হে নবী আপনি বলে দিন) আমি কী তোমাদের তার চেয়ে উত্তম বস্তুর কথা বলবো? পরহেযগারদের জন্য তাদের রবের নিকট রয়েছে এমন সব উদ্যান, যার তলদেশে নহর প্রবাহিত, যাতে তারা অনন্তকাল থাকবে, এবং (তাদের জন্য আরো) রয়েছে পাক-পবিত্র সঙ্গিনী ও আল্লাহর সন্তুষ্টি’। (সূরা আলে ইমরান-১৫)।

দুনিয়ার লোভে মানুষ কী না করতে পারে? ঘৃণ্য থেকে ঘৃণ্যতর কাজও করতে পারে মানুষ দুনিয়ার মোহে পড়ে। নারী, বাড়ী, সম্পদ ও সন্তানাদি সবই দুনিয়ার অন্তর্ভূক্ত। তবে সৌভাগ্যবান তারা যারা এগুলোকে গ্রহণ করে দ্বীনদারি হিসেবে। নারীকে জীবন সঙ্গী বানায় নিজের পবিত্রতা রক্ষার জন্য। সম্পদ উপার্জন করে হালাল তরীকায় এবং ব্যয় করে আল্লাহর নির্দেশিত পথে। একটি প্রচলিত কথা আছে, যদিও অনেকে এটাকে হাদিস মনে করে, কিন্তু প্রকৃত অর্থে হাদিস নয়। কথাটি হচ্ছে, দুনিয়ার প্রতি মোহ সমস্ত অনিষ্টের মূল। আসলে বাস্তবেও তাই। লাগামহীন জীবনাচারের কারণে মানুষের চাহিদা বেড়ে যাচ্ছে বহু বহুগুণ বেশি। সে অনুযায়ী বৈধ উপার্জন না পেয়ে পাঁ বাড়াচ্ছে অসৎ পথে। এরপর হারিয়ে যাচ্ছে অমানিশার ঘোর অন্ধকারে।

দুনিয়ার মোহে পড়ে আখেরাতকে ভুলে থাকা প্রকৃত ক্ষতি: ক্ষতিগ্রস্থ মনে করা হয় যার ব্যবসায় লস হয়েছে তাকে। কিন্তু প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে ওই লোক যে দুনিয়াকে নিজের আসল মাকসাদ বানিয়ে নিয়েছে। পরকালকে ভেবে নিয়েছে পরের কাজ। আল্লাহ তায়ালা এ বাণী উচ্চারণ করে মানুষকে সতর্ক করে দিয়েছেন। সূরা মুনাফিকুনে বলা হয়েছে ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদের আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল না করে। যারা এ কাজ করবে, ওরাই ক্ষতিগ্রস্থ।’ (সূরা: মুনাফিকুন, আয়াত: ৯)। কারণ হচ্ছে, দুনিয়া ও দুনিয়ার ভোগ বিলাস ক্ষণস্থায়ী। আর আখেরাত ও আখেরাতের নাজ নিয়ামত চিরস্থায়ী। আর সামান্য সময়ের শান্তির জন্য যে দীর্ঘ জীবনকে ক্ষতিগ্রস্থ করে তাকে কেউ লাভবান বলে না, নির্বোধ বোকা বলে।

 

জান্নাতকে ঢেকে দেয়া হয়েছে কষ্ট দ্বারা আর জাহান্নামকে ঢাকা হয়েছে আকর্ষণীয় বস্তু দ্বারা: এ ব্যাপারে একটি হাদিস রয়েছে। হাদিসটি হজরত আবু হুরাইরা (রা.) এর সূত্রে সুনানে নাসায়ী, তিরমিজী ও আবু দাউদে বর্ণিত হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ তায়ালা প্রথম যখন জান্নাত সৃষ্টি করলেন তখন হজরত জিবরাঈল আমীন (আ.)-কে পাঠালেন ঘুরে দেখে আসার জন্য। আল্লাহর নির্দেশ পেয়ে তিনি গেলেন এবং জান্নাতের নাজ-নেয়ামত দেখে ফিরে এলেন। আসার পর তিনি আল্লাহ তায়ালার সামনে জান্নাতের বর্ণনা দিয়ে বলেন, আমার মনে হয় কেউ জান্নাতের নেয়ামতের কথা শুনার পর তা পেতে কোনো রকম কসুর করবে না বরং সকলেই জান্নাত পেয়ে যাবে। এরপর আল্লাহ তায়ালা জান্নাতকে কষ্ট- ক্লেষ দিয়ে ঢেকে দেন। আবার হজরত জিবরাঈল আমীন (আ.)-কে নির্দেশ দিলেন যাও! আবার জান্নাত থেকে ঘুরে এসো। অবস্থা প্রত্যক্ষ করে ফিরে এসে এবার হজরত জিবরাঈল আমীন মন্তব্য করলেন, আমার রবের ইজ্জতের কসম, আমার ধারণা বান্দাদের কেউ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। জাহান্নাম সৃষ্টির বেলায়ও তেমনটি ঘটেছিলো। আল্লাহ তায়ালা জাহান্নামকে সৃষ্টির পর হজরত জিবরাঈল আমীনকে তা পরিদর্শনে পাঠান। সেখানে গিয়ে ভয়াবহ সব দৃশ্য দেখে এলেন। এসে মন্তব্য করলেন, হে আমার রব! জাহান্নামের ভয়াবহতা সম্পর্কে কেউ জানবে আর সে জাহান্নামে যাবে এমন কখনো হবে না। এরপর আল্লাহ তায়ালা জাহান্নামকে সুশোভিত করে দিলেন বিভিন্ন মোহনীয় বস্তু দ্বারা। যার লোভ সামলানো মানুষের জন্য প্রায় অসম্ভব। তারপর আবার হজরত জিবরাঈল আমীনকে নির্দেশ দিলেন, যাও! জাহান্নাম পরিদর্শন করে এসো। আল্লাহর নির্দেশে হজরত জিবরাঈল আমীন আবার জাহান্নাম পরিদর্শনে গেলেন। ফিরে এসে মন্তব্য করলেন, আমার রবের ইজ্জতের কসম খেয়ে বলছি, আমার মনে হয় কোনো বান্দাই জাহান্নাম থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারবে না বরং সকলেই জাহান্নামে প্রবেশ করবে’।

হাদিসের মর্ম স্পষ্ট যে, আল্লাহ তায়ালা জাহান্নামে যাওয়ার উপকরণসমূহকে মানুষের সামনে লোভনীয় করে দিয়েছেন। যে কারণে মানুষের মন সর্বদা সেদিকেই ধাবিত হয়। আর জান্নাতে যাওয়ার উপকরণগুলোকে করেছেন তিক্ত ও অপ্রীয়। যার দরুণ মানুষের মন সে দিকে যেতে চায় না। বরং সে দিকে যেতে হলে মনের সঙ্গে কঠোর মেহনত মোজাহাদা করতে হয়। আর এর জন্য প্রয়োজন হয় আল্লাহর ভয় ও আখেরাতে জবাবদিহিতার বিশ্বাস। তাতে কোনোরূপ শিথিলতা দেখা দিলে মনের সঙ্গে পেরে ওঠা যে কারো জন্যই মুশকিল।

তাছাড়া জান্নাতের বিষয়সমূহ হচ্ছে পরবর্তী কালের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আর জাহান্নামে যাওয়ার উপকরনগুলো হচ্ছে ইহকালিন ভোগ বিলাসিতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এটাও মানবকে ধোঁকায় ফেলে দিচ্ছে। তাই মুমিনের কর্তব্য হচ্ছে আল্লাহর আখেরাতের ভয়কে সুদৃঢ় করা ও মনের খাহেশাতকে ঝেড়ে ফেলে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে সর্বদা অগ্রাধিকার দেয়া। রাসূল (সা.) সংক্ষিপ্ত শব্দেও একথা আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘জাহান্নাম খায়েশ ও স্বাদযুক্ত বস্তু দিয়ে ঢাকা আর জান্নাত ঢাকা কষ্ট ও কঠোরতা দিয়ে’। হাদিসটা বর্ণনা করেছেন প্রসিদ্ধ সাহাবি হজরত আবু হুরাইরা (রা.)। সহিহ বোখারী ও মুসলিমে তা এসেছে।

 

এটাও দেখা যায় যে, যখন কোথাও ঘোষণা হয়, আজ ওমুক জায়গায় ত্রাণ বা সরকারের পক্ষ থেকে পুরস্কার দেয়া হবে তখন সকলে তা পাওয়ার আশায় চেষ্টা তদবির শুরু করে। কিন্তু জাহান্নাম ও জান্নাত এমন দুটি বিষয়, যার একটি থেকে বাঁচার জন্য আর অপরটি লাভের জন্য আমাদের সর্বদা চেষ্টা তদবির করা দরকার কিন্তু আমরা তা করছি না। এই কথাটা রাসূল (সা.) সহজভাবে আমাদের বুঝিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি জাহান্নামের ন্যায় ভয়াবহ কোনো বস্তু দেখিনি। অথচ তা থেকে যাদের দৌঁড়ে পালানোর কথা ছিলো তারা আজ শুয়ে ঘুমোচ্ছে। আর জান্নাতের ন্যায় আরাম-আয়েশের কোনো বস্তু আমি আজ পর্যন্ত কোথাও দেখিনি। যারা এর তলবে দৌঁড়ানোর কথা তারাও আজ ঘুমোচ্ছে। (তিরমিজী)

মুমিনের পরিচয় দ্বীনের পথে অগ্রসর হওয়া: রাসূল (সা.) মক্কায় যখন দাওয়াতের কাজ শুরু করেন তখন কাফেররা তাঁকে দেখলেই পালাতো। দ্বীনের পথে এসে যাওয়াকে নিজেদের জন্য দুর্ভাগ্য মনে করতো। সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তায়ালা মহাগ্রন্থ আল কোরআনে মানুষের এই স্বভাবের নিন্দা জ্ঞাপন করেছেন। আজ আমাদের মাঝেও অনেকে আছেন যারা দ্বীনের কথা শুনার জন্য সময় ব্যয়ের ব্যাপারে কৃপণতা করেন। কখনো দ্বীনের দায়ীদের বিরোধীতা করা হয়। আবার প্রয়োজনে নিজেদের দ্বীনদার হিসেবে পরিচয় করাতেও কোনো কুণ্ঠাবোধ করা হয় না।

আমার বিশ্বাস, যাদের ভেতর এই মন্দ স্বভাব লুকিয়ে আছে তারা কখনো ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করতে পারবে না। আল্লাহ না করুন- এই মন্দ স্বভাবের কারণে আমি ঈমানের মতো অমূল্য সম্পদ থেকেও বিরত হতে পারি। তাই সকল মন্দ স্বভাবকে ঝেড়ে ফেলে দিতে হবে। অগ্রসর হতে হবে ঈমানের পথে।

আর্কাইভ

জুলাই ২০১৯
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« জুন    
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০৩১