প্রচ্ছদ

চিকিৎসার অভাবে মৃত্যু পথযাত্রী স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের লুৎফর

Eurobanglanews24.com

স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সদস্য লুৎফর রহমান চিকিৎসার অভাবে আজ মৃত্যুর পথযাত্রী। তিনি বাচঁতে চান। কিন্তু এখন তার এই দুর্দিনে কাউকে কাছে পাচ্ছেন না জাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তান ।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দেশ স্বাধীনের বহু আগেই বিদেশের মাটিতে দেশের জাতীয় সংগীতের সাথে সাথে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যার্থে ফুটবল নিয়ে যে ৩৬ জন খেলোয়াড় দেশ বিদেশে ছুটে বেড়িয়েছেন, তাদেরই অন্যতম সদস্য লুৎফর রহমান।

মুজিবনগরে গঠিত বাংলাদেশ ক্রীড়া সমিতির সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা বাংলাদেশের অহংকার যশোরের লুৎফর রহমান প্রায় ৬ মাস যাবৎ ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মুমূর্ষু অবস্থায় বিছানায় পড়ে থাকলেও তাকে এখন দেখার কেউ নেই। যে মানুষটা এ জাতিকে মুক্তির স্বাদ এনে দিতে সহযোগিতা করেছেন। একটি স্বাধীন মানচিত্র রচনার জন্য সহযোগিতা করেছেন।আজ তার এই দুর্র্দিনে পাশে এসে দাড়ায়নি সরকার। এমনকি ফুটবলের কোনো পৃষ্ঠপোষক।

অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতার কারনে এই বীর বঞ্চিত হচ্ছেন সুচিকিৎস্যাসহ মৌলিক অধিকার থেকে। যশোর লোন অফিস পাড়ায় তার নিজ বাসভবনে গিয়ে লুৎফর রহমানের সাথে কথা বলে বেরিয়ে এলো স্বাধীন বাংলা ফুটবল এবং তার ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের তথ্য। ১৯৫১ সালে জন্মগ্রহণকারী  লুৎফর রহমান ছোটবেলা থেকে ফুটবল এবং হকি খেলায় আগ্রহী এবং পারদর্শী ছিলেন। যশোর জিলাস্কুলের পঞ্চম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালীন তিনি স্কুলের এক খেলায় শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়ের পুরষ্কার পান। সে ১৯৬৫ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত যশোর জেলা ফুটবল দলের হয়ে নিয়মিত অংশগ্রহণ করেন। এ ছাড়া তিনি ১৯৬৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান বোর্ড দলের পক্ষে পশ্চিম পাকিস্তানের সম্মিলিত বোর্ডের বিরুদ্ধে খেলেছিলেন। ১৯৬৯ সালে ‘ঢাকা ওয়ারী ক্লাব’যোগ দেন এবং ১৯৭০ সালে দলের অধিনায়কত্বের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৩ সালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয় দলের হয়ে রাশিয়ার মিনস্ক ডায়নামো ফুটবল দলের বিরুদ্ধে খেলায় অংশ গ্রহণ করেন।

এর আগে যখন স্বাধীনতা যুদ্ধের ডামাডোলে যখন বাংলাদেশের তরুণ সমাজের সিংহভাগ নিজের মাতৃভূমিকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে পাকিস্তানী শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে চলছিলো, ঠিক তখনই খেলার মাঠের এ নায়ক বেছে নিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের আরেক কৌশল , স্বাধীনতা সংগ্রামে গ্রহণ করেছিলেন এক অনন্য সাধারণ নজিরবিহীন অত্যুজ্জ্বল ভূমিকা।

 

 

যুগে যুগে দেশে ব্যতিক্রমধর্মী ভূমিকা তাতে দিয়েছে নবতর আঙ্গিক, নবতর সংযোজন। দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সপক্ষে জনমত সৃষ্টিসহ খেলোয়াড়দের ডাক দিয়ে সংঘবদ্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন মুষ্টিমেয় কয়েকজন তরুণ- আলী ইমাম, প্রতাপ, প্যাটেল, জাকারিয়া পিন্টু, আশরাফ, হাকিম এবং মুজিবনগরে গঠিত বাংলাদেশ ক্রীড়া সমিতির সাধারণ সম্পাদক লুৎফর রহমান এবং আরো অনেকে- স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গঠিত হলো।

তিনি বলেন, ‘আমরা ভারতের বিভিন্ন প্রায় ১৬টি প্রদর্শনী ম্যাচ খেলে ভারতীয় মুদ্রায় ৩ লক্ষ টাকা তৎকালীন বাংলাদেশের অস্খায়ী সরকারের কাছে দিয়েছিলাম। ১৬টি খেলার মধ্যে এই দল ১২টি খেলায় আমরা জয়লাভ করি এবং বাকি ৪টির ৩টিতে পরাজয়, ১টিতে ড্র হয়’।

তিনি বলেন, ‘আমাদের সব থেকে গৌরবময় খেলাটি ছিল ২৪ জুলাই ভারতের কৃষ্ণনগরে নদীয়া স্টেডিয়ামে। ঐদিন ছিলো স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের প্রথম খেলা। খেলোয়াড়রা আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো যে, বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা নিয়ে তারা মাঠ প্রদক্ষিণ করবে। এরপর মাঠে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় সঙ্গীতের তালে তালে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার সাথে সাথে ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করতে হবে। বিষয়টি নদীয়া ক্রীড়া সমিতিকে যথাসময়ে অবহিত করা হয়। এই খেলাকে উপলক্ষ্য করে নদীয়ার কৃষ্ণনগরে ব্যাপক গণজাগরণ সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের পোস্টার শহরের উল্লেখযোগ্য স্থানসমূহে শোভিত হয়। নানা মাধ্যমে শহর জুড়ে ব্যাপক প্রচার চলে।

স্বাধীন বাংলা বেতার মারফত খেলার বিষয়ে অবহিত হয়ে কুষ্টিয়া জেলা থেকে উৎসাহী ক্রীমামোদীরা বিপুল সংখ্যায় মাঠে সমবেত হলেন। কিন্তু ঝামেলা হলো বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত বাজানো ও জাতীয় পতাকা উত্তোলন নিয়ে। ভারতের সরকার তখন পর্যন্ত প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি। বিভ্রান্তির মধ্যেই খেলার নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলো। নদীয়া জেলা একাদশ মাঠে উপস্থিত। কিন্তু পতাকা ও জাতীয় সংগীতের বিষয়ে নিষ্পত্তি ছাড়া মুক্তিযোদ্ধা ফুটবল দল মাঠে নামবে না কিছুতেই। অবশেষে নদীয়ার জেলা প্রশাসক স্বত:প্রণোদিত হয়ে ভারত ও বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন ও জাতীয় সংগীত বাজানোর বিষয়ে সম্মত হলেন।

পিন্টু-প্রতাপের হাতে ধরা মানচিত্র খোচিত বটল গ্রীন পটভমিতে লাল সূর্য বুকে নেয়া বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা দল ‘জয় বাংল’ গগণবিদারী ধ্বনির মাঝে মাঠ প্রদক্ষিণ করলো। আবেগ বিহ্বল অশ্রুসজল নয়নে প্রতিটি বাঙালি খেলোয়াড় পতাকাকে চুম্বন করলেন, ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’ সংগীতের মূর্ছনায় ভারতের জাতীয় পতাকার সমর্যাদায় উত্তোলিত হলো স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা। একটি গর্বিত জাতির সমৃদ্ধ ইতিহাসে সোনালী অধ্যায় সূচিত হলো।

 

 

এই খেলার মাধ্যমে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা প্রথমবারের মতো বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে অন্য একটি স্বাধীন দেশের পতাকার সমমর্যাদায় উত্তোলিত হয়। এ ঘটনার পর নদীয়ার জেলা প্রশাসক সাময়িকভাবে বরখাস্ত হন এবং নদীয়া জেলা ক্রীড়া সংস্থার এ্যাফিলিয়েশন বাতিল করা হয়। কিন্তু এ সংস্থার নজিরবিহীন ঘটনা রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের বিপুলভাবে উৎসাহিত করে মুক্তিযুদ্ধের অনুকূলে সুদূরপ্রসারী প্রভাব সৃষ্টি করে।

এ ব্যাপারে জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক খেলোয়াড় কাউসার আলী বলেন, ‘চলতি বছরের গত ২০জুন শ্রদ্ধেয় লুৎফর ভায়ের যশোর লোন অফিস পাড়ার বাড়ীতে উপস্থিত হয়ে অত্যন্ত বেদনার্ত, মর্মাহত এবং লজ্জিত হলাম। দেখলাম জাতি তথা আমাদের যশোরের গর্ব ‘স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল’ এবং জাতীয় ফুটবল খেলোয়াড় লুৎফর ভাই প্রায় ৬মাস যাবৎ ব্রেন স্ট্রোক এ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু শয্যায় শায়িত। তাঁর এ অসুস্থতার সাথে শরীরের মধ্যে যুক্ত হয়েছিল আরও এক মরণ ব্যাধি ডায়াবেটিস। ব্রেন স্টোক এর ঔষধের সাথে সাথে প্রতিদিন ৩বার ইনসুলিন নিয়ে বেঁচে থাকার নিরন্তর প্রচেষ্টায় ৬৮ বছর বয়সে লুৎফর ভায়ের প্রতিটি ক্ষণ।

কী বিচিত্র আমাদের সমাজ আর দুর্ভাগ্য লুৎফর ভায়ের যে এই বেদনার খবর তার পরিবার ছাড়া যশোর তথা দেশের কেউ রাখিনা বা জানিনা। দুর্ভাগা চিত্রটা আরো প্রকট হয়ে উঠলো যখন জানা গেলো মাস্টার্স পাস করা একমাত্র মেয়ে ফারহানা শারীরিক ও মানসিক অসুস্থ হয়ে মা-বাবার কাছে আশ্রিত। তেমনি একমাত্র পুত্র তানভির ভাগ্যদোষে বেকার হয়ে অসহায়, বিব্রত এবং বিচলিত। গত কয়েক বছর হতেই লুৎফর ভায়ের একমাত্র আয়ের উৎস ব্যবসার ঝুলিও ভাগ্যদোষে গুটিয়ে ফেলতে হয়েছে। অদৃশ্য অনটনের তাড়নায় লুৎফর ভায়ের পরিবারের প্রতিটা সকাল শুরু হয় বটে, তবে তা যেনো শেষ হতে চায়না।

এ ব্যাপারে যশোর জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা ইয়াকুব কবির বলেন,‘লুৎফর দেশ তথা আমাদের যশোরের গর্বিত সন্তান, তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে সরাসরি যুদ্ধ করেন। এরপর তিনি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের পক্ষে অংশ নিয়ে বিশ্বের দরবারে ক্রীড়ার মাধ্যমে দেশকে মহান স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেন’।

তিনি বলেন, ‘আমি তার অসুস্থতার খবর শোনামাত্রই তার খোঁজ খবর দিয়েছি, তার সাহায্যে এগিয়ে আসা আমাদের কর্তব্য। তিনি লুৎফরের পরিবারের পাশে দাড়াবার জন্য জাতির জনকের কন্যার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন’।

একইভাবে সরকার তথা দেশের সকল বড় বড় ক্রীড়ার পৃষ্ঠপোষকদের এগিয়ে আসার জন্য দেশবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন যশোরের আরো এক ক্রীড়া সংগঠক লুৎফর ভাইয়ের সহপাঠী চিন্ময় সাহা।

 

বিনোদন

আর্কাইভ

অক্টোবর ২০১৯
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« সেপ্টেম্বর    
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০৩১