প্রচ্ছদ

পাস না করেও ১৭ শিক্ষার্থী ভর্তি!

Eurobanglanews24.com

রোগীদের চিকিৎসাসেবায় অন্তঃপ্রাণ ‘লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প’ খ্যাত ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের কল্যাণে সারাবিশ্বে নার্সিং একটি মহৎ পেশা হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ছোট পরিসরে নার্সিং পরিদফতর হিসেবে এর যাত্রা শুরু। এ পেশার আধুনিকায়ন ও সেবার মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০১১ সালে নার্সিং পরিদফতরকে নার্সিং অ্যান্ড মিডওয়াইফারি অধিদফতরে রূপান্তর করা হয়। মহাপরিচালকসহ প্রয়োজনীয় জনবলের অনুমোদন দেয়া হয়।

নার্সদের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নার্সদের তৃতীয় শ্রেণি থেকে দ্বিতীয় শ্রেণির পদমর্যাদা দেন। এত কিছুর পর কেমন চলছে নার্সিং সেক্টর। বিগত দু-তিন দশক ধরে নার্সিং পেশায় রয়েছেন এমন প্রবীণ নার্সরা হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, ভালো নেই নার্সিং সেক্টরের লোকজন।

নার্সিং কলেজ ও ইনস্টিটিউটে ভর্তি পরীক্ষা, বদলি, পদায়ন, কেনাকাটা, প্রশিক্ষণ, পিআরএল, টাইম স্কেল, জিপিএফের টাকা উত্তোলন, মাতৃত্বকালীন ছুটি ও অর্জিত ছুটি- সর্বত্রই অনিয়ম ও দুর্নীতির শিকড় গেড়েছে। নার্সদের মধ্যে গ্রুপিং ও কোন্দলের কারণে নষ্ট হচ্ছে সম্প্রীতি। নার্সিং সেক্টরের অনিয়ম ও দুর্নীতিসহ সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জাগো নিউজ’র বিশেষ সংবাদদাতা মনিরুজ্জামান উজ্জ্বলের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।

নার্সিং অ্যান্ড মিডওয়াইফারি অধিদফতরে যেন দুর্নীতির মচ্ছব চলছে। অধিদফতরটির অধীনে পরিচালিত রাজধানীসহ সারাদেশের বিভিন্ন নার্সিং কলেজ ও ইনস্টিটিউটে ভর্তি পরীক্ষা, শিক্ষার্থী ভর্তি, চাকরিতে বদলি, পদায়ন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র, কম্পিউটার, কম্পিউটার সামগ্রী ও স্টেশনারিসহ কেনাকাটা, প্রশিক্ষণ, পিআরএল, টাইম স্কেল, জিপিএফের টাকা উত্তোলন, মাতৃত্বকালীন ছুটি ও অর্জিত ছুটি নিয়ে খোদ অধিদফতরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কতিপয় অসৎ কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে গজিয়ে ওঠা একটি সংঘবদ্ধ চক্র শত শত অসহায় ও সাধারণ নার্সদের কাছ থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা অবৈধভাবে হাতিয়ে নিচ্ছেন।

সম্প্রতি জাগো নিউজ’র এক অনুসন্ধানে দেশের বিভিন্ন নার্সিং ইনস্টিটিউটে কমপক্ষে ১৭ জন ভুয়া শিক্ষার্থীকে অবৈধ উপায়ে ভর্তির নজিরবিহীন দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। ভুয়া ওই শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা উৎকোচ গ্রহণের মাধ্যমে এ অবৈধ ভর্তি বাণিজ্য সম্পন্ন হয়।

গত ডিসেম্বরে কেন্দ্রীয়ভাবে অনুষ্ঠিত ডিপ্লোমা ইন নার্সিং সায়েন্স অ্যান্ড মিডওয়াইফারি কোর্সে মেধাবী ও যোগ্যপ্রার্থীদের বঞ্চিত করে ভুয়া শিক্ষার্থীদের ভর্তি করা হয়। জাগো নিউজ’র অনুসন্ধানে শুধুমাত্র ভর্তিরই চাঞ্চল্যকর তথ্য নয়; বদলি, পদায়ন, ক্রয়, প্রশিক্ষণ, পিআরএল, টাইম স্কেল, জিপিএফের টাকা উত্তোলন, মাতৃত্বকালীন ছুটি ও অর্জিত ছুটি মঞ্জুর করতে গিয়ে প্রতিদিন শত শত নার্সকে নানা গঞ্জনার মুখাপেক্ষী হওয়ার করুণ চিত্র উঠে এসেছে।

nurse

অনুসন্ধানে জানা গেছে, যে ১৭ জন ভুয়া শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছে ভর্তি পরীক্ষার ফলাফলে তাদের নাম মেধা তালিকায় তো দূরের কথা, তাদের কেউ ভর্তি পরীক্ষায় পাস নম্বর পর্যন্ত পাননি। প্রকাশিত ফলাফলে মেধা কিংবা অপেক্ষমাণ তালিকায়ও তাদের নাম ছিল না। অথচ খোদ নার্সিং অ্যান্ড মিডওয়াইফারি অধিদফতরের মহাপরিচালক ও ভর্তি কমিটির সভাপতি তন্দ্রা শিকদারের স্বাক্ষর ও সুপারিশে তাদের ভর্তি করা হয়।

ওই ১৭ জনের মধ্যে দুজন নোয়াখালী, চারজন যশোর, তিনজন কুমিল্লা, একজন করে মুন্সিগঞ্জ, পিরোজপুর, কিশোরগঞ্জ, রাঙ্গামাটি, নওগাঁ, দিনাজপুর, মানিকগঞ্জ, পটুয়াখালী ও ঢাকা কমিউনিটি নার্সিং কলেজে ভর্তি করা হয়। ‘টাকা হলে বাঘের চোখ মেলে’- এমন প্রবাদের মতো অবৈধভাবে ভর্তি হওয়া এসব ‘গুণধর’ শিক্ষার্থী গত পাঁচ মাসেরও বেশি সময় ধরে ক্লাস করছেন।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের চিকিৎসা শিক্ষা ও নার্সিং বিভাগ, নার্সিং অধিদফতর ও নার্সিং কাউন্সিলের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, ভর্তিতে অনিয়মের এ ঘটনা শুধু ডিপ্লোমা কোর্সেই প্রথমবারের মতো ঘটেছে- এমনটি নয়। নিরপেক্ষ তদন্ত হলে বিভিন্ন সময় সরকারি নার্সিং কলেজ ও নার্সিং ইনস্টিটিউটের পোস্ট বেসিক বিএসসি নার্সিং, বেসিক বিএসসি নার্সিং ভর্তি পরীক্ষার ফলাফলে একাধিকবার এমন অনেক ঘটনার প্রমাণ মিলবে বলে তারা মন্তব্য করেন।

আক্ষেপ করে তারা আরও বলেন, ‘লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প’ খ্যাত ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের মহৎ পেশা অর্থাৎ নার্সিং শিক্ষায় এখন আতুর ঘরেই দুর্নীতির বীজ বপন করা হচ্ছে। এবার হাতেনাতে এর অকাট্য প্রমাণ মিলেছে।

উল্লেখ্য, গত বছরের ৭ ডিসেম্বর প্রথমবারের মতো নার্সিং অ্যান্ড মিডওয়াইফারি অধিদফতরের অধীনে কেন্দ্রীয়ভাবে ১০০ নম্বরের নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্নপত্রে বিএসসি ইন নার্সিং, ডিপ্লোমা ইন নার্সিং সায়েন্স অ্যান্ড মিডওয়াইফারি এবং ডিপ্লোমা ইন মিডওয়াইফারি কোর্সে এ ভর্তি পরীক্ষা হয়।

৪৩টি সরকারি ডিপ্লোমা ইন নার্সিং সায়েন্স অ্যান্ড মিডওয়াইফারি ইনস্টিটিউশনে দুই হাজার ৫৮০টি, ৩৮টি ডিপ্লোমা ইন মিডওয়াইফারি ইনস্টিটিউশনে ৯৭৫টি এবং চার বছর মেয়াদি ১৮টি সরকারি বিএসসি ইন নার্সিং কলেজে আসন সংখ্যা এক হাজার ৪৩৫টি। এসব আসনের বিপরীতে অর্ধলক্ষাধিক শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন।

ভর্তি নীতিমালা অনুসারে, ভর্তি পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে জাতীয় মেধা তালিকা প্রণীত হয়। মেধা তালিকার পর অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে শিক্ষার্থী ভর্তি করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্যরা নিয়ননীতি তোয়াক্কা না করে ১৭ জন ভুয়া শিক্ষার্থী ভর্তি করে।

আর্কাইভ

সেপ্টেম্বর ২০১৯
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« আগষ্ট    
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০