প্রচ্ছদ

অন্য চোখে দেখা ক্যাম্পাস

Eurobanglanews24.com

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

 

ক্যাম্পাস ক্যানভাস

 

নুসরাত শারমিন

 

বেগুনি জারুল ফুলের চাদর, লাল কৃষ্ণচূড়ার শামিয়ানা, বর্ষায় ছোট ছোট বাচ্চাদের হাতে থোকায় থোকায় কদম ফুল, শরতের শুভ্র কাশফুলের আবরণে ঢাকা সবুজ পাহাড় কিংবা শিউলিতলা। প্রকৃতির সব রূপ-রঙের বদল চোখে পড়বে এখানেই; ছোট-বড় সবুজ পাহাড় আর বন দিয়ে সাজানো হাজারো শিক্ষার্থীর প্রাণের ক্যাম্পাস চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে।

 

সকালের শাটল ট্রেন দিয়ে শুরু হওয়া ব্যস্ততা শেষও হয় রাতের শাটলেই। এই শাটলই ক্যাম্পাসের প্রাণ। প্রতিদিন শহর থেকে হাজারো তরুণ প্রাণ ক্যাম্পাসে পদার্পণ করে। গান-আড্ডার কেন্দ্রবিন্দু এই শাটল। চিৎকার করে ‘এমন যদি হতো’, ‘বকুল ফুল’, ‘সেই তুমি কেন এত অচেনা হলে’, ‘তোমার জন্য নীলচে তারায়’…এসব গান গাওয়ার জন্যই যেন শাটল তৈরি হয়েছিল। একবার শীতের শেষ দিকে শাটল থেকে সূর্যাস্ত দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। শেষ বিকেলে ট্রেনের বগিতে শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে সঞ্জীব চৌধুরীর ‘আমি তোমাকেই বলে দেব’ গান, আর সঙ্গে ধীরে ধীরে ডুবতে থাকা লাল-কমলা সূর্য স্মৃতির পাতায় অজান্তেই একটা মধুর সময়কে বন্দী করেছিল।

 

যারা প্রকৃতি ভালোবাসে, প্রকৃতির কাছাকাছি থাকতে চায়, প্রতিমুহূর্তে প্রকৃতির রূপ তারা আস্বাদন করতে পারবে এখানেই। সেটা হোক শাটল থেকে শুভ্র কাশফুলের ওপর হাত ছোঁয়ানো মুহূর্ত, হোক সেন্ট্রাল ফিল্ডের সবুজ মাঠে হাজারো পাখির কিচিরমিচির শব্দের মাঝে বসে সূর্যাস্ত দেখা কিংবা ফরেস্ট্রিতে পিচঢালা রাস্তায় বৃষ্টির পর ঝরে পড়া সবুজ পাতার হরেক রকম রূপ দেখা! পুরো ক্যাম্পাসটাই সৌন্দর্যে বুঁদ হয়ে আছে। কলার ঝুপড়ি, লেডিস ঝুপড়ির হইচই, শহীদ মিনারে গিটারের টুংটাং, কাটা পাহাড়ের রাস্তায় সোডিয়াম লাইটগুলোর মায়াবী আলো, সুনামি গার্ডেনে আড্ডা, ঝুলন্ত সেতু, মউয়ের দোকানের ভিড়, সবুজ ফরেস্ট্রি এবং ঝুলন্ত সাঁকো, দোলা সরণি, বোটানিক্যাল গার্ডেন, গোলপুকুর-বায়োলজির পুকুরপাড়, হতাশার মোড়, অত্যাধুনিক ল ফ্যাকাল্টি, সবুজ সেন্ট্রাল ফিল্ড, ভূতের বাড়ি, পামবাগান, জারুলতলা, মুক্তমঞ্চ, বুদ্ধিজীবী চত্বর, কলা ফ্যাকাল্টির পেছনের ঝরনা, রোমাঞ্চকর চালন্দা গিরিপথ—সবকিছুতেই মুগ্ধতা ছড়িয়ে রয়েছে।

 

নিত্যনতুন উৎসব-অনুষ্ঠানে ক্যাম্পাস সব সময় মুখরিত থাকেই। তবু এখানকার সবচেয়ে বড় উৎসব পয়লা বৈশাখ। ১৪ এপ্রিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মানুষের এত ভিড় হয় যে এত বড় ক্যাম্পাসেও হাঁটার তিল পরিমাণ জায়গা খুঁজে পেতে কষ্ট হয়। আমার প্রিয় ক্লাস ছিল করিম স্যারের স্ট্যাটিসটিকস ক্লাস। এক দিনের জন্যও মিস দিইনি। কিন্তু একবার দেরি করে ক্লাসে গিয়েছিলাম। স্যার খুব মধুরভাবে হেসে বলেছিলেন, ‘ওয়েলকাম, ওয়েলকাম’। স্যারের ক্লাসে কেউ দেরি করে গেলেও স্যার তাকে ক্লাসে ঢোকার অনুমতি দিতেন এবং বলতেন ‘ওয়েলকাম’। তাঁর মতে, একেবারে না আসার চেয়ে দেরি করে আসা ভালো।

 

দ্বিতীয় বর্ষের আরেকটা ক্লাস খুব স্মরণীয়। সেটা হলো আতিক স্যারের ‘গল্পের বইয়ের ক্লাস’। সেদিনের ক্লাসে স্যার সবাইকে যার যার প্রিয় গল্পের বইয়ের নাম জিজ্ঞেস করেছিলেন। ক্যাম্পাসে যে ঘটনা মনে দাগ কেটে দিয়েছে সেটা হলো—একবার এক আপুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আপনি হলে ওঠেন না কেন?’ আপু উত্তর দিয়েছিলেন, ‘দেখো, এখানে সবার অর্থনৈতিক অবস্থা সমান নয়। অনেকের পরিবার তাদের মেয়েদের কোনো রকম সাহায্যই করতে পারে না। খুব কাছে গেলে দেখতে পারবে, কতটা সংগ্রাম করে ওরা। বিলাসিতার কোনো ছোঁয়াই নেই তাদের জীবনে। আমি হলে সিট পাব আমি জানি। আমি না উঠলে আমার সিটে কে উঠবে, তা আমি জানি না। হয়তো খুব সাধারণ কেউ সুযোগ পাবে। সেই সাধারণ কেউয়ের জন্য আমি হলে উঠছি না। আমার চেয়ে হলের সিট তার বেশি দরকার।’

 

কে বলে বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা শুধু ক্লাসরুমই শিখি? পুরো ক্যাম্পাসই আমাদের ক্লাসরুম।

 

আর্কাইভ

সেপ্টেম্বর ২০১৯
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« আগষ্ট    
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০