প্রচ্ছদ

স্বপ্নভঙ্গ

Eurobanglanews24.com

হজরত আলী শান্তশিষ্ট ভদ্র প্রকৃতির। অফিসে সবাই তাকে ‘হজরত’ বলে ডাকে। তবে তিনি সবাইকে ‘আলী’ নামে ডাকতে বলেছেন। অ্যাকাউন্সের আতিক সাহেব তাকে ‘হজরত’ নামে এই অফিসে চাকরির শুরু থেকে ডাকছেন বলে সবাই তাকে এ নামেই এখন ডাকে।

 

 

 

হজরত একজন ভীষণ স্বপ্নবাজ যুবক। জীবনে তাকে বড় একটা কিছু করতেই হবে—এমন চিন্তায় সব সময় নিমগ্ন থাকেন তিনি। হয়তো অর্থ বিত্ত বৈভবে অনেক বড়; নয়তো এমন কোনো কাজ করতে হবে যাতে দেশের মানুষ তাকে একনামে চিনতে পারে। কিন্তু কীভাবে হবে তার এ স্বপ্ন পূরণ, তার কোনো পথ এখন আর খুঁজে পাচ্ছেন না হযরত আলী।

 

ভালো চাকরি করে জীবন বদলাতে চেয়েছিলেন হজরত আলী। অনেক চেষ্টা করেছেন সরকারি-বেসরকারি ভালো চাকরির জন্য। তবে বড় কোনো চাকরি জোটাতে পারেননি। চাকরির পরীক্ষা দিতে দিতে হজরত আলী বুঝেছেন—বড় চাকরি আসলেই সোনার হরিণ, তা সহজে ধরা দেয় না।

 

অবশেষে অনেক চেষ্টা তদবীর করে একটি বেসরকারি চাকরি জুটিয়েছেন হজরত আলী।

 

যে চাকরি করে জীবন বদলাতে চেয়েছিলেন, এখন সেই চাকরিই যেন তার সব সম্ভাবনার পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে। হজরত আলীর ভাষায়, তিনি এখন জীবনের মাইনকা চিপায় আটকে পড়েছেন। এই চাকরিতে তিনি মোটেই সন্তুষ্ট নন।

 

হজরত আলীর স্বপ্ন ছিলো—তিনি অনেক বড় চাকরি করে গ্রামের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য একটি হাসপাতাল নির্মাণ করবেন। নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের জন্য একটি উন্নত পাঠাগার গড়ে তুলবেন, গ্রামে যাতে আলোকিত মানুষ তৈরি হয়—এরকম আরও কত কত স্বপ্ন হজরত আলীর দুচোখজুড়ে। কিন্তু যে বেতনে হযরত আলী চাকরি করছেন, তাতে তার ঢাকার শহরে নিজের খাই-খরচেই চলে যায়। ফলে দিন দিন তার দুচোখের স্বপ্ন ম্লান হতে থাকে। তবুও হজরত আলী স্বপ্ন দেখতে চান।

 

হজরত আলী ‘দৈনিক সুসময়’ নামের একটি জাতীয় দৈনিকের প্রেস ম্যানেজারের পদে চাকরি করছেন। ঢাকার মতিঝিলে তার পত্রিকার অফিস। হজরত আলী অনেক গুণধর মানুষ। তার গানের গলা অনেক সুন্দর, সেই সঙ্গে নিজে গানও লেখেন, অভিনয় করতে পারেন, আবৃত্তিতেও পারদর্শী। প্রায়ই কাজের ফাঁকে রুম বন্ধ করে দরাজ কণ্ঠে গান শুরু করেন।

 

প্রেসের কাজের চাপে তার সকাল সন্ধ্যা রাত অবধি ব্যস্ত থাকতে হয়। মাঝে মধ্যে প্রেসের শ্রমিকদের ভালোভাবে কাজ বুঝিয়ে দিতে নিজের হাতে ধুলো ময়লা কালি মাখতে হয়ে। অনেক সময় গা গতরেও ময়লা কালি লেগে যায়। হজরত আলী প্রায়ই তার অফিস রুমে বসে ভাবেন আর দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন—এই জীবন তো আমি চাইনি।

 

চাওয়া না পাওয়া আর প্রত্যাশা অপূরণের এই যাপিত জীবনের হতাশা গ্লানি সব কিছু ভেতরে ভেতরে মেনে নিয়েছেন হজরত আলী। তিনি একজন আত্মপ্রত্যয়ী ও স্বপ্নবাজ মানুষ হলেও এখন তার মনে প্রায়ই হতাশা ও বিষণ্ন তা ভর করে।

 

নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে এবং দেশের জন্য কিছু করার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে না পারার দুশ্চিন্তায় এখন প্রায়ই তার ঘুম হয় না।

 

সেই সঙ্গে সম্প্রতি তার প্রেমিকার সঙ্গে সম্পর্ক ছেদের বিরহ-বেদনাও হজরত আলীকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। তার প্রেমিকা বিয়ের জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেছেন। কিন্তু হজরত আলীর বড় চাকরি না হওয়ায় প্রেমিকা অন্যের ঘর বেঁধেছে। হজরত আলী এমন নানা বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে দিনে দিনে বুঝতে পারছেন, পৃথিবীতে অর্থ-বিত্তই হচ্ছে মানুষের কাছে একমাত্র কাম্য বস্তু। প্রেম ভালোবাসা মিছে কল্পনা। টাকা না থাকলে প্রেম ভালো হৃদয়টাকে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। দুচোখের সুখনিদ্রা নিষ্ঠুরভাবে কেড়ে নেয়।

 

গত রাতে হজরত আলী স্বপ্ন দেখেছেন, তিনি ‘দৈনিক সুসময়’ পত্রিকার প্রেস ম্যানেজারের দায়িত্ব ছেড়ে এই পত্রিকার বিনোদন বিভাগে সাংবাদিকতা শুরু করেছেন। এমন স্বপ্ন দেখে হজরত আলীর ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর আবার ঘুমানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কিছুতেই আর চোখে ঘুম আসেনি। হজরত আলী বুঝতে পেরেছেন শত চেষ্টা করেও আর ঘুম আসবে না। মোবাইল টিপে দেখেন রাত সাড়ে চারটা বাজে।

 

রাত আর বেশি নেই ভেবে বিছানা ছেড়ে উঠে যান হজরত আলী। ঘুম থেকে উঠে হজরত আলী ফ্রেশ হয়ে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ায়। শেষ রাতে আকাশ দ্যাখে, বাহ! কী সুন্দর আকাশ! আর কোনোদিন যেন হজরত আলী এত মনোলোভা নয়নসুখকর বিস্তীর্ণ আকাশ দেখেননি। এদিকে মিষ্টি বাতাসও বইছে, গ্রীষ্মের শেষ রাতে যে এমন হালকা শীতল হাওয়া বইতে পারে তা ভেবে হজরত আলীর মন চনমনিয়ে ওঠে। এমন মনোমুগ্ধকর পরিবেশে হজরত আলীর গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছে করছে। গান শুরু করলেও মুহূর্তেই থেমে যান তিনি। কারণ এখনও আশপাশের ফ্লাটের সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, এখন গান গাইলে মানুষ পাগল বলবে।

আর্কাইভ

জুলাই ২০১৯
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« জুন    
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০৩১