প্রচ্ছদ

বিলাতে বাঙালির ক্রিকেট: অর্ধেক খেলা তার অর্ধেক জীবন

Eurobanglanews24.com

কী বলবেন? শুধুই কি খেলা? আমি বলি বাঙালীর জন্য ক্রিকেট এখন অর্ধেকটা খেলা আর অর্ধেকটা জীবন। শুধু জীবন না জীবন-যৌবন-প্রাণ-মন-ধন। এই নিয়েই বিলাতে চিরচেনা বাঙালির মুখ। সেই পুরনো মধু-মুখ, সাথে পেটে পুরনো সেই বিষ।

 

নিশ্চয়ই মাঠের বাইরে ছিলাম। বাইরেরও বাইরে যাবার সুযোগ হয়েছে। তাই এই ক্রিকেট বিশ্বকাপের দুই ম্যাচে কেমন ছিলাম আমরা? যেমন, ছিলাম আমরা…এসব গাল-গপ্পো নিয়েই এই লেখা।

 

পড়েছি ব্রায়ান লারা যদি টের পেতেন- তিনি আউট, তবে আর কারও সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতেন না। সোজা সাজঘরের দিকে হাঁটা। একদম সৎ নিপাট ভদ্রলোক। তার কাছে ক্রিকেট শুধুই একটা খেলা। ক্রিকেটের সেই দিন কি আর আছে? আগেই বলেছি বিষয়টা আমাদের কাছে ভিন্ন।

 

লেখার এই পর্যায়ে ইহা মনে হয় মেলা।

 

বাংলাদেশের প্রথম দুই ম্যাচ ছিলো ওভালে। কাছাকাছি দুই ট্রেন স্টেশন ওভাল আর ভক্সোল। একটা করে ট্রেন থামে আর সমর্থকদের  শরীরের সব শক্তি এক করে ‘বাংলাদেশ’, ‘বাংলাদেশ’, চিৎকার। সে চিৎকার গগনবিদারী নয় ভূ-বিদারী। শত কণ্ঠে বাঙলাদেশ পৌঁছে যায় লন্ডনের আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে আন্ডারগ্রাউন্ডে। সেই চিৎকারে কেঁপে উঠতে দেখিছি লন্ডন আন্ডারগ্রাউন্ড কর্মীদের।

 

বোন-ভাবী-ভাই-দুলাভাই-শালা-খালা-মা-দাদী-স্ত্রী-স্বামী-দুধের শিশু-বার্গারের শিশু-একা-দোকা সব্বার মেল ওভাল।

 

দক্ষিণ আফ্রিকার খেলার দিনের কথাই ধরুন না। এক দক্ষিণ আফ্রিকান দেশি ভাই আরেক দেশির কাছে কী চাইতে পারে?

 

প্রথমত কিছুই না। তারপরও বড়জোড় পানির বোতল। কিংবা একটু আধটু ফেভার। কিন্তু খালি চোখে এর কিছুই তেমন দেখিনি। কানেও শুনিনি।

 

কিন্তু অনেক চিৎকারের ভেতর নিজের কর্ণকুহরে প্রবেশ করে- ”ভাবি আমার জন্য এক্সট্রা ডায়াপার আনছিলেন তো?”

 

ভাবতে পারেন ভাবি- ক্রিকেটের কতো বড়ো ফ্যান! টয়লেটে পর্যন্ত যেতে চান না!

 

এরকম হরেক ভাবি-আপার ভিড়ে সেরা হলেন তারাই…যারা উত্তেজনার বশে ভুলেই যান বাংলাদেশে কাদের বিপক্ষে খেলছে। শুধু তা না, প্রথম আট ওভার ব্যাটিং করার পর সেটা ঘোষণা দিয়ে জানতে চান!

 

একদল রমণী আপন মনে ছবি তুলেই যাচ্ছেন। উনাদের দেখে মনে হতে পারে ‘ক্রিকেট তুমি কি কেবলই ছবি!’

 

ভায়েরাও কম যান না। দুই সিট পেছনে একজন ব্যস্ত ধারাভাষ্যে। মুখের ভাষায় কমলালেবুর ঘ্রাণ। এক সারি নিচেই পিচ রিপোর্টার এবং জলবায়ুবিদ। মুখের ভাষায় পেয়ারার সুবাস। এতো এতো ক্রিকেটিয় বিশেষজ্ঞের ভিড়ে নিজেকে আপনার ক্রিকেটিয় অর্বাচীন মনে হলে দোষ দেবার কিছু থাকবে না।

 

ওভালের মাটি ফুরে যেন ভেসে উঠে ‘বাংলা’ নামের ব-দ্বীপ। যেখানে চট্টগ্রামের মানুষ বলতে থাকে দক্ষিণ আফ্রিকা আর নিউ জিল্যান্ড বাংলাদেশের সাথে ‘খেলা খায়’ ( খেলা খেলে)। সিলেটিরা বলে মাহমুদল্লাহ রিয়াদ শুধুই উবায় (দাড়িঁয়ে ) থাকে। তিন বছর ধরে লন্ডনে থাকা সবুর ভাযের ছোট্ট মেয়ে বলে উঠে- ‘বোতলের মুখটা খুলে দাও বিগ হেল্প হবে’।

 

এই শত শত বাঙালির মাঝে বসে আপনার মনে হতে পারে , বাঙালি কী বেশি ভালোবাসে! ক্রিকেট নাকি নিজের দেশ?

 

আমি ভেজাল ভালো পাই না। তাই নির্ভেজাল ভাষায় বলতে চাই, দুটোর কোনটাই না। এরা ভালোবাসে নিজের চেহারা।

 

নিজের চেহারাখানা একবার স্ক্রিনে দেখা যাবে। ব্যস এই আশায় সাদা চামড়ার ক্যামেরাম্যানকে বাঙালি নিজের মায়ের ব্রাদারহুড বর্গা দেয়।

 

ক্যামেরাম্যান দেখলেই ‘মামা’, ‘মামা’, ডেকে পেছন পেছন দৌড়।

 

এক ক্যামেরাম্যানকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘মামা’ ডাক কেমন লাগছে?

 

– একটু কনফিউজড। আমি তো ছেলে আমাকে মাম্মা ডাকছে কেন? আমি বড়জোড় পাপা হতে পারি।

 

আমি বোঝাই, ‘মামা’ মানে তুমি তাদের মায়ের ভাই।

 

– ওরে বাবা তোমাদের দেশে তো আমি কোনদিনও যাইনি। তারপরও আমার এতো এতো বোন। আর কিছু কিছু বোনের ছেলে তো আমার বাবার চেয়েও বয়সে বড়। যাক শেষমেষ নিজের কাজ নিয়ে গর্ব করার মতো একটা কারণ তো পাওয়া গেলো। আই অ্যাম দ্য মামা অব বেঙ্গালিস।

 

তবে বিদেশি দর্শকরাও কম যান না। এক নিউ জিল্যান্ড দর্শক আর পাকিস্তানি দর্শক। তাদের মাথাতেও আমাকে টিভিতে দেখাও ভূত। পাকিস্তানি অনেক চেষ্টা করেও বাংলাদেশের পতাকা কিনতে পারেনি। পেয়েছে নিউ জিল্যান্ডের পতাকা। আমি বললাম- আইডিয়া খারাপ না। নিউ জিল্যান্ডের ফ্যান তো কম। তোমাকে দেখাবেই। হলোও তাই এই দুই দর্শকের কল্যাণে আমি নিজেও টিভিতে…

 

শুধুই ক্রিকেট। তাই দেশ থেকে বিদেশে। বিলেতে। এমন বাঙালি পাওয়া যাবে ভুরিভুরি। এই পর্যায়ে খেলাকে মনে হবে হারানো মানুষের আসর কিংবা ঈদের আগের বা পরের পুনর্মিলনী। আমরা যারা করে খাই- এমন অতিথি’র ডরে একটু আধটু সরে যাই।

 

বিশ্বকাপের আগে আগেই অফিসের কাজের চাপ বেড়ে যায়। এখানে সেখানে অফিসের কাজে ট্যুরে যেতে হয়। কিন্তু গ্যালারির ত্রিশ গজের ভেতর দেখা হয়ে যায় ঠিকই। সেই সব চেনা দেশি মুখ। এই সব চেনা মুখের সাথে আবার একবারের বেশি দুইবার দেখা করার সুযোগ নেই। কারণ অর্থ বিভ্রাট। ওভালে নগদ কোনও কারবার নাই। সবই ডেবিট কিংবা ক্রেডিট কার্ডে। ৫০ পেন্সের চিপস (ডোবা তেলে আলু ভাজা) কিনতে ছোঁয়াতে

 

আর্কাইভ

জুন ২০১৯
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
« মে    
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০